
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। আর করোনা মহামারিতে গত তিন বছরে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়েছে, আয় কমেছে অনেকের। এ রকম পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রীর দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
চাল, ডাল, তেল মুরগি, সবজি মাছ মাংশ ডিম অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাড়তি দামে হতাশা প্রকাশ করেছে ক্রেতারা। রাজধানী লক্ষিবাজারের বাসিন্দা অনুপ হাওলাদার বলেন, দ্রব্যমূল্য প্রতিনিয়ত অকল্পনীয়ভাবে বেড়েই চলেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত মানুষেরা সংসার চালাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। যেভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও ইনকাম বাড়তেছে না।
এদিকে রায়সাহেব বাজার থেকে ব্রয়লার মুরগির ক্রেতা কলতাবাজারের বাসিন্দা খালেদা আক্তার বলেন, দফায় দফায় বাড়ছে নিত্যপন্যের দাম। এখন আরও যোগ হয়েছে ব্রয়লার মুরগি, এক সপ্তাহ ব্যবধানে ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা কেজিতে বেড়েছে পাশাপাশি ডিমও সবজির দাম। তাই সরকারের নিত্যপন্যের দিকে নজর দিতে হবে। বিগত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ব্রয়লার মুরগির দাম। এতে এক সপ্তাহে ৪০ টাকা বেড়ে ব্রয়লার মুরগির কেজি ২০০ টাকা ছুঁয়েছে। ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম। প্রথমবারের মতো ফার্মের মুরগির এক ডজন ডিমের দাম ১৪৫ টাকায় উঠেছে। এর সঙ্গে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের সবজি। তবে কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমেছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি করছেন ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির কেজি ছিল ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা।
ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি দাম বেড়েছে পাকিস্তানি কক বা সোনালি মুরগির। সোনালি মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা।
মুরগির দামের বিষয়ে রায়সাহেব বাজারের ব্যবসায়ী জাকির বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে এখন আমাদের ট্রাক প্রতি অনেক খরজ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাইকারিতে প্রতিদিনই ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ছে।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, এখন বাজারে ব্রয়লার মুরগির সরবরাহ কম। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্রয়লার মুরগির দাম এমন বেড়ে গেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার কারণে সোনালি মুরগির দামও বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম না বাড়লে মুরগি আর একটু কম দামে পাওয়া যেতো বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা। আর মুদি দোকানে প্রতি পিস ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ডিমের ডজন ছিল ১২০ থেকে ১২৫ টাকা।
ডিমের দাম বাড়ার বিষয়ে পাঁচভাই ঘাটলেন ব্যবসায়ী নাজমুল বলেন, গত কয়েকদিনে মুরগির দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। মুরগির দাম বাড়ার প্রভাব ডিমের দামে পড়ছে। নাজমুল বলেন, গত সপ্তাহে এক ডজন লাল ডিম ১২৫ টাকায় বিক্রি করেছি। তেলের দাম বাড়ানোর পর গত কয়েকদিন হুটহাট ডিমের দাম বেড়েছে। এখন এক ডজন ডিম ১৪০ টাকা বিক্রি করছি। এর আগে কখনো ডিম এতো দামে বিক্রি করিনি। সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে সব থেকে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে শিম। ২৫০ গ্রাম শিম বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা। তবে কেউ এক কেজি কিনলে ১৯০ টাকা রাখা হচ্ছে। গত সপ্তাহে ২৫০ গ্রাম শিম বিক্রি হয় ৪০ টাকা।
শিমের পাশাপাশি দাম বেড়েছে পাকা টমেটোর। গত সপ্তাহে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া পাকা টমেটো এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর গাজর গত সপ্তাহের মতো ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। বরবটিও গত সপ্তাহের মতো ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
তবে শসার দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া শসা এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বেগুনের কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁকরোলের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কাঁচা পেঁপের কেজি ৩০, পটল ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। করলা ৮০ টাকা, কচুর লতি, ঝিঙে, চিচিঙ্গার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। করলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে এসব সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবজির দামের বিষয়ে কলতাবাজারের ব্যবসায়ী সাদ্দাম বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব সবজির দাম বেড়েছে। এর মূল কারণ তেলের দাম বাড়ানো। তেলের দাম বাড়ানোর কারণে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে সবজির দামে। তেলের দাম না বাড়লে এখন সব সবজির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা কম থাকতো।
ডিম, মুরগি ও সবজির দাম বাড়লেও সপ্তাহের ব্যবধানে অপরিবর্তিত রয়েছে পেঁয়াজ ও আলুর দাম। পেঁয়াজ গত সপ্তাহের মতো ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। তবে কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমে কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ৩০০ টাকায় উঠেছিল। মাছ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রুই মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। তেলাপিয়া, পাঙাস মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। শিং মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। কৈ মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। পাবদা মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে এসব মাছের দামে কেজিতে ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে ইলিশও। এক কেজি ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা। ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। আর ৪০০-৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।


