আজ ক্রীড়াঙ্গনের জীবন্ত কিংবদন্তি আবদুস সাদেকের ৮০তম জন্মদিন

মো. মজিবুর রহমান : বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে জীবন্ত কিংবদন্তি আবদুস সাদেক।

তিনি ফুটবল, হকি, ক্রিকেটসহ অনেক ক্রীড়া ইভেন্টে ছিলেন পারদর্শী। এই কিংবদন্তি অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের খেলোয়াড়ও ছিলেন।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রথম ফুটবল অধিনায়ক ও হকি অধিনায়ক ছিলেন আবদুস সাদেক।

আজ বৃহস্পতিবার এই কিংবদন্তি’র ৮০তম জন্মদিন।ক্রীড়াঙ্গনের এই লাভার বয় জীবন্ত কিংবদন্তির জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত ক্রীড়া পরিবারে।

আবদুস সাদেক যেমন তারকা খেলোয়াড় ছিলেন, তেমনি কোচ এবং সংগঠক হিসেবেও দেখিয়েছেন মিউজিক। ব’ঙ্গ’ব’ন্ধু হ’ত্যা’র পর চরম দুঃসময়ে আবাহনীকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি।

বাংলাদেশের ক্রীড়ায় অসামান্য অবদানের পুরস্কার হিসেবে আবদুস সাদেক ১৯৯৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন।

আবদুস সাদেকের বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ব্রিটিশ আমলে ছিলেন খ্যাতনামা সাঁতারু। তাঁর ছোট ভাই শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানও ছিলেন একজন হকি খেলোয়াড়।

আবদুস সাদেক পাকিস্তান জাতীয় দলে যেভাবে ডুকেন: ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পরও তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের রোষানলে পড়ে। তখন বাঙালিদের মেধা বিকাশের কোন সুযোগ ছিল না। সেই পরিবেশেও পাকিস্তানের জাতীয় হকি দলে ডাক পান আবদুস সাদেক।

সাদেক সেই সময় অর্থাৎ ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক দলেও ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু ইনজুরির কারণে খেলা হয়নি তাঁর। তবে পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে ইউরোপ সফর করেছেন।

কিন্তু ১৯৬৯ সালে ইউরোপ ট্যুরে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং ইংল্যান্ডে খেলেছেন আবদুস সাদেকরা। সেই ট্যুর শেষে ফেরার পথে মিসরের সঙ্গেও একটা ম্যাচ খেলেছেন।

সেই সময় ইউরোপ ট্যুরে ক্যারিশমা দেখানোর কারণে আবদুস সাদেক সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বিশেষ করে দলের সেরা তারকা রশিদ জুনিয়রের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন সাদেক।

১৯৬৮ সালের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান দলের সেরা তারকারাও ইংরেজি জানতেন না। সাদেক জানতেন, যার জন্য সবার নিকট সাদেকের আলাদা কদর ছিল।

পূর্ব পাকিস্তান যুবদলে খেলেছেন সাদেক। স্বাধীনতার পর জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে ১৯৭৩ সালে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন সাদেক।

ঢাকা আবাহনীর প্রথম ফুটবল ও হকি অধিনায়ক ছিলেন এই কিংবদন্তি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের। তখন সাদেক আবাহনীর তাবুতে চলে আসেন।

আবদুস সাদেক স্বাধীনতার আগে ভিক্টোরিয়া ও দিলকুশার মতো জনপ্রিয় ক্লাবে খেলে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। সে সময় শেখ কামাল ঢাকা আবাহনীর ফুটবল ও হকি দলের নেতৃত্বের ভার তুলে দেন সাদেকের কাঁধে। তখন হকিতে আবাহনীকে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন করে আস্থার প্রতিদান দেন এই কিংবদন্তি।

আবদুস সাদেকের নেতৃত্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হন আবাহনী। ১৯৭৭ সালে আবাহনী প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নেন আবদুস সাদেক। নতুন দায়িত্ব পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তিনি।

১৯৭৭ সালে লিগে কোনো ম্যাচেই হারেনি আবাহনী। তিন ম্যাচ ড্র ছাড়া বাকি সব ম্যাচেই পেয়েছেন ক্যারিশমাটিক জয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে আবাহনী অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অসাধারন রেকর্ড সৃষ্টি করে।

স্বাধীন বাংলাদেশে সেবারই প্রথম কোনো দল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

সাদেক স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে বলেন, ‘আমি তখন কোচের দায়িত্ব নিতে চাইনি, সালাউদ্দিন ও অধিনায়ক আশরাফ উদ্দিন আমার বাসায় এসে অনুরোধ করেন, আপনি ছাড়া দলে কোনো যোগ্য প্রশিক্ষক পাওয়া যাবে না। বলতে পারেন তাদের অনুরোধেই আমি কোচ হতে রাজি হয়ে যাই।

প্রতিটি ম্যাচে খেলোয়াড়রা অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দলকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ানশিপ এনে দেয়। ’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিষেকেই কোচের দায়িত্ব পেয়ে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। ফাইনালে রহমতগঞ্জকে হারানোর পর কেঁদে ফেলেছিলাম। আমি বলব, এই শিরোপা আমার জীবনে অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। ’

হকিতেও তিনবার প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে আবাহনীকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন এই কিংবদন্তি।

সংগঠক হিসেবেও সফল সাদেক: প্রশিক্ষকের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর।

সাদেক ১৯৮৩ হতে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁরই সময় ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকি অনুষ্ঠিত হয়। সে বছর আয়োজক হওয়ার কথা ছিল জাপানের। এশিয়ান হকি ফেডারেশনের বৈঠকে সাদেকের কথায় মুগ্ধ হয়ে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরানের সমর্থনে আয়োজকের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের হকি বা ফুটবলে প্রাণ পুরুষ আবদুস সাদে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশে এমন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আবাহনীর দুঃসময়ের কান্ডারি সাদেক: ১৯৭৫ সালে বিপদের সময় সাদেকের সাহসিকতার কারণে হয়তো মাথা উঁচু করে টিকে আছে আজকের আবাহনী।

ফুটবল, ক্রিকেট, হকিতে সবাইকে পেছনে ফেলে আবাহনী আজ দেশসেরা দল। সাদেকের অসামান্য অবদানের কথা চিন্তা করে আবাহনী লিমিটেড তাঁকে করেছে ‘আজীবন সদস্য’।

আবদুস সাদেক যখন বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের নেতৃত্বে: ১৯৭৭-৭৮ সালের হকি মৌসুমে প্রথম জাতীয় দল গঠন করা হয়।

তখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন টেস্টে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন এই তারকা। সেই হকি টেস্টে একটিতে জয়, একটিতে ড্র ও একটিতে পরাজিত হয় বাংলাদেশ।

১৯৭৮ সালে প্রথম এশিয়ান গেমসে অংশ নেয় বাংলাদেশ আর সেই দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন কিংবদন্তি হকি তারকা আবদুস সাদেক।

ক্রীড়াঙ্গনের জীবন্ত কিংবদন্তি আবদুস সাদেক-এর ৮০তম জন্মদিনে খেলাধূলা ও বিনোদনের খবর-এর পক্ষ থেকে রইল শুভেচ্ছা ও নিরন্তর ভালোবাসা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরূপালী ব্যাংকের ব্যবসায়িক অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা
পরবর্তী নিবন্ধইসলামী ব্যাংক রাজশাহী জোনের ব্যবসায় উন্নয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত