
জিয়াদ আমিন খান
ঢাকা, এমনকি চট্টগ্রাম শহরের অনেকের কাছেই মিরসরাই যেন কেবল একটি দূরবর্তী উপজেলা— শান্ত ও নিরিবিলি। মাঝে মাঝে সংবাদপত্রে আসে কোন না কোন কারখানা উদ্বোধন বা সড়ক দুর্ঘটনার খবর। কিন্তু আমি এর কাদামাটি মাড়িয়েছি, কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছি, মায়েদের সঙ্গে কেঁদেছি, তরুণদের চোখে স্বপ্ন দেখেছি। আমি বলতে পারি; মিরসরাই বাংলাদেশের গল্পে কোনও ফুটনোট নয়। এটি এক নতুন ফ্রন্টিয়ার, যা জেগে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে।
মিরসরাই শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, এটি একটি জাতীয় প্রবেশদ্বারও বটে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রবেশদ্বার অবহেলিত, অনুন্নত এবং অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এ অবস্থা থেকে সমৃদ্ধ অঞ্চলটির উত্তরণের উপায় কী?
মিরসরাই বাংলাদেশের আগামী অর্থনৈতিক বিপ্লবের ভ্রূণ। এটি এমন এক জায়গা যেখানে পাহাড় মিলেছে সমুদ্রের সঙ্গে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা মিলেছে প্রতিকূলতার সঙ্গে—আর সেখানে আমরা যদি আত্মতুষ্টির বদলে সাহস বেছে নিই, তবে বাংলাদেশ তার শিল্প ও অভিবাসনের গল্প নতুন করে লিখতে পারে।
মিরসরাইয়ে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) গড়ে উঠছে। এটা অঞ্চলটির জন্যে কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। বিনিয়োগকারীরা এই অঞ্চলে যে সম্ভাবনা দেখছেন সেটা এলাকার রাজনীতিবিদদের চোখ এড়িয়ে গেছে। মিরসরাই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের জন্যে যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ। এলাকাটির পাশেই পাহাড়, সমুদ্রবন্দর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমশক্তির যথেষ্ঠ যোগান রয়েছে এই অঞ্চলে।
মিরসরাই একটি সীমান্ত প্রবেশদ্বার। ফেনী নদীর সংযোগ একদিকে যেমন অঞ্চলটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে একইভাবে তৈরি করেছে অপার সম্ভাবনাও। পাচার ও মাদক সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ ঝুঁকি। হামেশাই চোরাই কাঠ, অবৈধ অস্ত্র থেকে শুরু করে ইয়াবার মতো মাদক পাচারের জন্যে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল এটি। একইসাথে শিল্প- বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্যেও বাংলাদেশের স্বর্ণদ্বার মিরেরসরাই।
তবে শুধু শিল্পই একটি অঞ্চলকে পাল্টে দিতে পারে না। যদি ওই অঞ্চলের রাস্তা জলস্রোতে নিয়মিত ভেঙে যায়, তরুণরা প্রশিক্ষণহীন থাকে, নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয় —তাহলে এটি যেন একটি শক্তপোক্ত কারখানাকে বালুর ওপর দাঁড় করানোর মতো দেখায়। তাই মিরেরসরাইয়ের উন্নয়নে শুধু ইপিজেডকেন্দ্রিকতা নয়, বরং রপ্তানিতে সুদক্ষ একটি তরুণ সম্প্রদায়ই পারে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটিকে বদলে দিতে।
মিরসরাইকে যদি গভীরভাবে দেখা হয় তাহলে এটি কেবল পাহাড়-সমুদ্র-রাস্তা আর নদীর এক জনপদই নয়, অঞ্চলটিতে রয়েছে অনেক স্বপ্নবাজ মানুষ। অঞ্চলটিতে এমন কৃষকরা আছেন যারা তুমুল পরিশ্রমে ফসল ফলিয়ে ন্যায্য মূল্যের দাবিদার; এমন মা, যারা স্বাস্থ্যসেবার অধিকারী; এমন তরুণ, যারা সম্মানজনক চাকরির আশা করে; এমন পরিবার, যারা চায় নিরাপদে সন্তানদের মানুষ করতে। এখানকার মানুষ শুধুমাত্র বেঁচে থাকতে চায় না, সমৃদ্ধি-মর্যাদা ও স্বীকৃতিও চায়।
আমি মিরসরাইয়ের প্রায় সব ইউনিয়ন এবং গ্রামে গিয়েছি। মানুষের সঙ্গে কথা বলার পর কিছু বিষয় উপলব্দি করেছি। মিরসরাইজুড়ে একটাই দাবি, ‘আমাদের রাস্তাটা ভাঙা এটা ঠিক করে দিন’। এই যে ভাঙা রাস্তা, এটি কেবল যাতায়াতের অসুবিধা নয়, এটি সুযোগ-সম্ভাবনার অন্তরায়। একটি খারাপ রাস্তা মানে কৃষক সময়মতো বাজারে উৎপাদিত ফসল নিয়ে যেতে পারেন না; গর্ভবতী মা চিকিৎসা পেতে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না; ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন।
তাই প্রতিটি গ্রামকে শিল্পাঞ্চল, বাজার ও সুযোগের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সড়ক অবকাঠামো আধুনিক করা জরুরি। রাস্তা তো কেবল কংক্রিট ও বিটুমিন নয়, এটি একটি এলাকার মর্যাদার প্রতীকও বটে। আর সেই মর্যাদা এখানকার মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে এমন অনেক পরিবার আছে যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে শুধু চিকিৎসক বা অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো পৌঁছায়নি কিংবা সময় মতো হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেননি – এইজন্যে। কেউ কেউ আবার ঋণ নিয়ে, উচ্চ সুদে টাকা ধার করে ওষুধ কিনতে বাধ্য হয়েছে- এমনও দেখেছি আমি। এ সমস্যার সমাধানের জন্য সদিচ্ছা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা কোনও সুবিধা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। তাই, স্বাস্থ্যসেবা সকলের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। গ্রামীণ ক্লিনিকগুলোর উন্নয়ন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ ও ধরে রাখা এবং মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা চালু করা দরকার যাতে দূরবর্তী এলাকাতেও চিকিৎসা পৌঁছানো যায়।
মিরসরাই উপজেলা যেমন বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার, তেমনি পাচারকারীদেরও অন্যতম টার্গেটও। ভারত থেকে অবৈধ মালামাল পাচার হচ্ছে নিয়মিত, মিয়ানমার থেকে অসাা ইয়াবার মতো মাদক তরুণদের ধ্বংস করছে, প্রাকৃতিক পাহাড় কেটে কাঠ-মাটি পাচার হচ্ছে, অস্ত্র পাচার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। সীমান্ত নজরদারি জোরদার, কমিউনিটি পুলিশিং বৃদ্ধি এবং কঠোর জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি নিরাপদ মিরসরাই মানেই একটি নিরাপদ বাংলাদেশ।
মিরসরাই বাংলাদেশের অন্যতম প্রবাসীঅধ্যুষিত একটি অঞ্চল। এ অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারের কেউ না কেউ প্রবাসী। প্রতি মাসে শত কোটি টাকা রেমিটেন্স আসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। প্রবাসী অধ্যুষিত হওয়ার সমস্যাও অনেক। প্রবাসী আয় দেখে বড় হওয়া অনেক কিশোর-তরুণ শুধু বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নেই তাদের যৌবনকাল ও প্রতিভার অপচয় ঘটাচ্ছেন। অনেকে প্রতারণার শিকার হয়ে, জীবনবিপন্ন করে প্রবাসে গেছেন এবং খালি হাতে ফিরে এসেছেন।
একটি ছোট উদ্যোগ এ অঞ্চলের এই বড় সমস্যাটির সমাধান করতে পারে। আর সেটি হলো- ‘সেফ মাইগ্রেশন হেল্পডেস্ক’ প্রতিষ্ঠা। যাতে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক মানুষ প্রতারণা থেকে সুরক্ষা, আইনি পরামর্শ ও প্রবাসে অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ পায়। পাশাপাশি, শিল্পভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়াতে হবে যাতে তরুণরা দেশে ও বিদেশে কাজের জন্য প্রস্তুত হয়। চাওয়া একটিই যাতে আমাদের তরুণরা দক্ষতা অর্জন করে প্রবাসে পাড়ি জমাতে পারে। যাতে তাদের প্রবাসজীবন নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ফলপ্রসূ হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, মিরসরাইয়ে এমন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে যাতে তরুণদের কাছে বিদেশে যাওয়া বাধ্যবাধকতা এবং একমাত্র লক্ষ্য না হয়ে বরং একটি বিকল্প চিন্তা হয়।
একটি সমৃদ্ধ অঞ্চলের উন্নয়ন মানে এই নয় যে, কতগুলো কারখানা হলো বা কত টন সিমেন্ট ঢালা হলো। উন্নয়ন মানেই কেবল সিমেন্ট নয়— এটি প্রতিটি স্তরে মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া রাস্তা, নদী, বন ও পরিবারের। তাই প্রাকৃতিক সম্পদ পাহাড়, বন ও নদী রক্ষা করতে হবে, যেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিবেশ ধ্বংসের কারণ না হয়। মিরসরাইকে হতে হবে টেকসই উন্নয়নের মডেল। এবং সবুজ শিল্প উদ্যোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সংরক্ষণ উদ্যোগের মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করা যায়।
আমি বিশ্বাস করি এই রূপান্তর কোনও স্বপ্ন নয়। এটি একটি রোডম্যাপ— যা সহজেই অর্জনযোগ্য, যদি আমরা সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারি। এজন্য মিরসরাই নিয়ে যে পরিকল্পনাগুলো হতে পারে-
সবুজ শিল্পের জন্য বিশেষ অঞ্চল
মিরসরাইয়ে এমন বিনিয়োগকে আকর্ষণ করতে হবে যা পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে যেমন- টেক্সটাইল, হালকা শিল্প ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল স্থাপন করা। এই কারখানাগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শূন্য-অবশিষ্ট নীতি ব্যবহার করা হবে।
সীমান্তে প্রযুক্তি নজরদারি
ফেনী সীমান্তে স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম বসাতে হবে, যাতে মাদক ও কাঠ পাচার রোধ হয়, আর বাণিজ্যপথ হয় নিরাপদ ও দ্রুততর।
দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি
তরুণদের জন্যে প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, যা তরুণদের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কাজের জন্য প্রস্তুত করবে। তাদেরকে— বাসস্থান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও স্থানীয় কর্মসংস্থানে উপার্জন পুনঃবিনিয়োগে সহায়তা করতে হবে।
রপ্তানি-নির্ভর তরুণ কর্মসংস্থান কেন্দ্র
ইপিজেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অংশীদারিত্বে স্থানীয় তরুণদের জন্যে এমন চাকরির বাজারে সম্পৃক্ততা তৈরি করতে হবে, যা প্রশিক্ষিত স্থানীয় শ্রমিকদের সরাসরি শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করবে, দালালদের বাদ দিয়ে শোষণ কমাবে।
মিরেরসরাই কি ম্যাকাও হবে?
মিরেরসরাই ইপিজেড তৈরির সময়ে অনেকেরই প্রশ্ন ছিল: আমারা কি একসময় চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল ম্যাকাওয়ের মতো হতে পারবো? আমার উত্তর সহজ— বাংলাদেশকে ম্যাকাও কপি করতে হবে না। বাংলাদেশকে মিরসরাইয়ে বিশ্বাস রাখতে হবে।
কারণ বিশ্বের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার প্রায় সকল উপাদান ইতোমধ্যেই মিরেরসরাইয়ের আছে— ভূমি, অবস্থান, শ্রমশক্তি এবং সবচেয়ে বেশি যা জরুরী সেটি হলো দেশের প্রতি ভালোবাসা। এখন দরকার বিচক্ষণ নেতৃত্ব। যে শুনবে, পরিকল্পনা করবে এবং বাস্তবায়ন করবে। সরকারের নীতিগত সহায়তা ও বিভিন্ন অংশীদারের যৌথ প্রচেষ্টায় এটি বড় সাফল্যে রূপ নিতে পারে।
তাই সবাই মিলে আসুন আমাদের এই ভুলে যাওয়া এই অর্থনৈতিক সীমান্তকে জাতীয় ফ্রন্টিয়ারে রূপ দিই। আসুন, প্রতিশ্রুত সুন্দর বাংলাদেশ গড়ি— শুরু হোক মিরসরাই থেকে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ


