
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ আট অর্থনীতিবিদ।
তাদের মতে, পরিস্থিতি কতটা গভীর হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়লে ডলার বাজার ও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আপাতত রিজার্ভ ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে এখনই নীতি সুদহার কমানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বিনিয়োগ বাড়াতে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে অভিমত তাদের।শনিবার (৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক বৈঠকে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। অর্থনীতিবিদরা বলেন, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা তাৎক্ষণিকভাবে ভোক্তা পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, কারণ এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে মুদ্রানীতি কমিটির এক সদস্যের পদত্যাগ এবং অর্থনীতিবিদদের আপত্তির কারণে সেই বৈঠক শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। এর মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সরকারের সম্ভাব্য নীতিগত পদক্ষেপ নির্ধারণে অর্থনীতিবিদদের মতামত জানতে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।বৈঠকে অংশ নেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।
এসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছাড়াও চার ডেপুটি গভর্নর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা একটি বিশেষ কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন, যা নিয়মিতভাবে অর্থনীতির পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জনসাধারণকে অবহিত করবে। এতে বাজারে অযথা আতঙ্ক ছড়ানো কমবে।
আলোচনায় উঠে আসে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আবারও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা- এই প্রেক্ষাপটে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা উচিত, সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মতামত জানতে চান গভর্নর। সেই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। একই নির্দেশনা ব্যাংকগুলোকেও দিয়েছেন, যাতে রাজনৈতিক চাপের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো কঠিন। তাই ক্ষতি কমানোর কৌশলের ওপর জোর দিতে হবে। বর্তমানে যে রিজার্ভ রয়েছে তা সংরক্ষণ করতে হবে এবং রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত ডলার খরচ করে আমদানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুরের মতো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তারা বলেন। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
এছাড়া বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ঋণ দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তেল আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে অতিরিক্ত ঋণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে বলে মত দেন অর্থনীতিবিদরা।


