
সরকারকে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার যে খবর সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, তা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সভায় সভাপতিত্ব করেন।
গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণখেলাপির আওতায় থাকলেও এর একটি বড় অংশের বিপরীতে কোনো দৃশ্যমান সম্পদ বা যথাযথ কাগজপত্র নেই।
ফলে এসব ঋণকে প্রচলিত অর্থে খেলাপি বলা কঠিন, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ বা চুরি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীরগতির কারণ বেনামি লেনদেন ও গোপন সম্পদ শনাক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে খেলাপিঋণের বিপরীতে সাধারণত সম্পদ থাকে এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির মাধ্যমে তা আংশিক উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদায়যোগ্য প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, মার্চেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটা হাইপাওয়ার মানি, ছাপানো টাকা। অর্থাৎ এটার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
এর ভিত্তিতে গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গভর্নর বলেন, এসব তথ্য দেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সরকারকে দেওয়ার তথ্য কোনোভাবেই সত্য না। এর আসলে কোনো অস্তিত্ব নেই।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস’ নামে একটি হিসাব রয়েছে, যার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক প্রয়োজন মেটানো হয়। এটি একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রচলিত।
গভর্নর বলেন, এই হিসাবের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে অস্থায়ীভাবে অর্থের প্রয়োজন হলে তা ওভারড্রাফটের মতো ব্যবস্থায় সমন্বয় করা হয়।
তিনি বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় এই হিসাবের স্থিতি ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করে বর্তমানে ১১ হাজার ১০৩ কোটিতে নেমে এসেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনোভাবেই নতুন করে টাকা ছাপানোর বিষয় নয়, বরং এটি সরকারের আয়-ব্যয়ের স্বাভাবিক নগদ ব্যবস্থাপনার অংশ। আজ টাকা নেওয়া হচ্ছে, কাল রাজস্ব আসলে তা সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে-এটাই নিয়মিত প্রক্রিয়া।
গভর্নর সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর সংবাদ দেশের ক্রেডিট রেটিংয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। রেটিং কমে গেলে সরকারের ঋণ গ্রহণের খরচ যেমন বাড়ে, তেমনি বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ গ্রহণও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। তাই দায়িত্বশীল সংবাদ প্রচারে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এর আগে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অর্থনীতি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় গভর্নর একীভূত করা পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব ব্যাংক এখনো সমন্বিত কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের আওতায় আসেনি। ফলে এক শাখা থেকে অন্য ব্যাংকের তথ্য বা সেবা পাওয়া যাচ্ছে না, যা কার্যক্রমে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এই সিবিএস (কোর ব্যাংকিং সিস্টেম) একীভূত করতে সময় লাগবে।
গভর্নর জানান, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে। যার মধ্যে পুনঃমূলধনীকরণ, বেসরকারীকরণ বা একীভূতকরণের মতো সিদ্ধান্তও থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কিছু সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্টার্ট-আপ খাতের উন্নয়নে ‘স্টার্ট-আপ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট’ নামে একটি উদ্যোগের কথা জানান গভর্নর। তিনি বলেন, প্রায় ৬০০ কোটি টাকার তহবিল নিয়ে আগামী মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এটি চালু হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য গ্র্যান্ট দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ৩০ জুনের পর আর কোনো বিকল্প কিউআর কোডের এক্সটেনশন দেওয়া হবে না। সবাইকে বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে হবে। এতে লেনদেনের আন্তঃকার্যক্ষমতা নিশ্চিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


