Wednesday, May 20, 2026
প্রচ্ছদ বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আনসার বাহিনীকে আরও দক্ষ-গতিশীল করে তুলবে: প্রধানমন্ত্রী

সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আনসার বাহিনীকে আরও দক্ষ-গতিশীল করে তুলবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলে আনসার বাহিনীর ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও দক্ষ এবং গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বুধবার (২০ মে) সকালে গাজীপুরের সফিপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি একাডেমির মিলনায়তনে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ-২০২৬ : ব্যুত্থান মহড়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে যোগদা দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের সব থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানেও এই বাহিনী ভূমিকা রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও সক্রিয় অবদান রাখছে।

তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় আনসার-ভিডিপির যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক কর্মকর্তা এবং সদস্যদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের আলোকে আপনাদের ‘ভিশন এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করলে, এই বাহিনীর ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও দক্ষ এবং গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোনো দেশেই যে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য অনিবার্য এবং অবশ্য পালনীয় নীতি হচ্ছে, ‘চেইন অব কমান্ড’ এবং ‘ডিসিপ্লিন’ মেনে চলা। এই দুটি বিষয়ে সামান্যতম অবহেলা পরিলক্ষিত হলেও কোনো একটি বাহিনী সুশৃঙ্খল বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না। এ বিষয়টি গভীরভাবে মনে রাখা দরকার। কোনো বাহিনীর মধ্যে ডিসিপ্লিনের অভাব পরিলক্ষিত হলে তাদের সম্পর্কে জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়, এ বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, আনসার ও ভিডিপির চারটি প্রধান স্তম্ভ— ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা বা উপজেলা আনসার এবং ভিডিপি-টিডিপি—এই প্রতিটি শক্তি সমন্বিতভাবে দেশের নিরাপত্তা ও তৃণমূলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। এই কাঠামোই বাহিনীটিকে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলভিত্তিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বর্তমানে ৪৭টি আনসার ব্যাটালিয়নের মধ্যে ১৬টি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োজিত। বাহিনীর ৫২ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। এই বাহিনীর ১৩ হাজারেরও বেশি হিল আনসার ও হিল ভিডিপি সদস্য বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি জোরদারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘একইসঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি পুরুষ ও একটি মহিলা ভিডিপি প্লাটুন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছে। একইভাবে, নগর এলাকায় টিডিপি সদস্যরা শহরে নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ফলে বাহিনীটি কেবল নিরাপত্তা রক্ষা নয়, সামাজিক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, আনসার ভিডিপি নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করছে, যা ইতিবাচক। ‘সঞ্জীবন প্রকল্পের’ মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক এবং ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ সহায়তা প্রদান এবং কারিগরি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটেছে।

দেশীয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগও সময়োপযোগী মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একইসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রক্রিয়াধীন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়ে আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ, সদস্যদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আনসার মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ৬জি ওয়েল্ডিংসহ বহুমাত্রিক ও চাহিদাভিত্তিক আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। এসব উদ্যোগ সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে, এ ধরনের দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সদস্যদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করছে এবং বাহিনীকে ক্রমান্বয়ে একটি কার্যকর মানব সম্পদ উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করছে। এ ধরনের উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা দেশে বিদেশে আনসার ও ভিডিপির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও বৃদ্ধি করবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপি বর্তমানে একটি নির্ভরযোগ্য “First Responder” স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বন্যা, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে এই বাহিনীর সাহসিকতা, দ্রুততা ও মানবিক দায়বদ্ধতা দৃষ্টান্তমূলক। একইসঙ্গে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যগণ টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছেন।

ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আনসার-ভিডিপির সাফল্যও প্রশংসনীয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম বাংলাদেশ গেমসে পরপর ৩ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০০৪ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে বর্তমান সরকার দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ক্রীড়াকে একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বর্তমান সরকার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খেলাধুলার বিভিন্ন ইভেন্টে যেসব খেলোয়াড় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলছেন, একটি বেতন কাঠামোর আওতায় এনে বর্তমান সরকার তাদের স্পোর্টস কার্ড দিয়েছে। আনসার ভিডিপির ১৫ জন ক্রীড়াবিদকেও বর্তমান সরকার স্পোর্টস কার্ড দিয়েছে।

আনসার এবং ভিডিপি বাহিনীর কাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ‘আনসার ব্যাটালিয়ন বিধিমালা, ২০২৬; ভিডিপি প্রবিধানমালা, ২০২৬; অঙ্গীভূত আনসার বিধিমালা, ২০২৬ এবং আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা, ২০২৬ -এর খসড়া প্রণয়নের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে এই বাহিনীর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে ‘উপজেলা আনসার প্রবিধিমালা ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বাহিনীর সদর দপ্তরে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

এর আগে সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনসার ভিডিপি একাডেমির ইয়াদ আলী প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। পরে তিনি আনসারদের মৌলিক প্রশিক্ষণ ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান উপভোগ শেষে আনসার বাহিনীর মিলনায়তনে যোগদান করে বক্তব্য রাখেন। পরে দেশের প্রতিটি জেলায় নিয়োজিত আনসার বাহিনী সদস্যদের সমস্যা জানতে চান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
পরবর্তী নিবন্ধব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন খাতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে: অর্থমন্ত্রী