
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাসের আগমুহূর্তে কর ও শুল্ক কাঠামোয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করতে যাচ্ছে সরকার। বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যবসা সহজ করা, মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমানো এবং বাজেটকে আরও গ্রহণযোগ্য করতে করপোরেট কর হ্রাস, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমানো, ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএনের বাধ্যবাধকতা বাতিল এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর প্রস্তাবিত একক ভ্যাট প্রত্যাহারের মতো একাধিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থবিল পাসের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন আনা হতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সোমবার (২৯ জুন) সংসদে অর্থবিল পাস হওয়ার কথা।
এনবিআর সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য এখন বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে শিল্প খাত চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য শর্তসাপেক্ষে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নয়, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণকারী কোম্পানিই এই সুবিধা পাবে।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সাধারণ করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। যেসব প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়ে এবং ক্যাশলেস লেনদেনসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে, তারা ২০ শতাংশ কর সুবিধা পায়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেসব তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশের কম শেয়ার বাজারে রয়েছে, তাদের করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ করা হতে পারে। অন্য করপোরেট করহার আপাতত অপরিবর্তিত থাকছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানান, এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু ব্যবসায়ীদের কর সুবিধা দেওয়া নয়; বরং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা।
সূত্র জানায়, কর কাঠামোয় আরেকটি বড় পরিবর্তন আসছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করহার ১০ শতাংশ। চূড়ান্ত বাজেটে তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের ধারণা, এতে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবে।
দেশে বর্তমানে ইউজিসি অনুমোদিত ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৩টি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া রয়েছে ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ২৬টি ডেন্টাল কলেজ এবং ২০টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পরিচালক বেলাল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরির উপকরণ ক্রয় এবং বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। এর পাশাপাশি ১০% আয়কর বহাল থাকলে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে, যা উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি করবে। তিনি এ করহার পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতেও বাজেটে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাই বহাল রাখার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পর সরকার তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে করমুক্ত আয়সীমা এক ধাপে ২৫ হাজার টাকা নয়, কার্যত আগের পরিকল্পনার তুলনায় ৫০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও ধাপে ধাপে এই সীমা বাড়িয়ে ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সাড়ে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও করদাতাদের প্রকৃত করের চাপ খুব বেশি কমবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ কর রেয়াতের সীমা কমানো এবং সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের ওপর কাটা উৎসে করকে চূড়ান্ত করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার বিধান বহাল থাকছে।
এদিকে সোনা বিক্রির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা করও পুনর্বিবেচনা করছে সরকার। চূড়ান্ত বাজেটে এটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করার আলোচনা চলছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক করদাতা অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার উদ্দেশ্যে কর ফাইলে অবাস্তব পরিমাণ স্বর্ণ দেখান। পরে সেটি বিক্রির আয় হিসেবে প্রদর্শন করেন। এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে মূলধনি মুনাফার ওপর কর আরোপ করা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের আপত্তির কারণে ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ হার নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে খুচরা পর্যায়ে একক ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তও স্থগিত করা হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে মুদি দোকান, প্রসাধনী দোকান, মিষ্টির দোকান, রেস্তোরাঁসহ ১৬টি খুচরা ও সেবামূলক খাতকে নির্দিষ্ট ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল। বছরে ৫০ লাখ টাকার কম বিক্রি হলেও এসব ব্যবসায়ীকে মাসে ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হতো। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, আপাতত এ বিষয়ে বিধিমালা করা হচ্ছে না। ফলে বাজেট পাস হলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে না।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, এমন ধরনের ভ্যাটে ছোট ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হবেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর এমন ভ্যাট আরোপের কোনো যৌক্তিকতা দেখি না মোট ভ্যাটের ৯৮ শতাংশ দেয় মাত্র ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান, কিন্তু নিবন্ধিত আছে ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান। বাকিরা কোথায়? তাদের না খুঁজে, ছোটদের ভ্যাট আরোপ করার ঠিক হবে না।
শেয়ারবাজারের স্বার্থেও সরকার অবস্থান পরিবর্তন করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর নিয়মিত করপোরেট করহার প্রযোজ্য করার প্রস্তাব ছিল। চূড়ান্ত বাজেটে তা বাতিল করে আগের মতো ২০ শতাংশ করহার বহাল রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ নামে জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য বিনা প্রশ্নে প্রদর্শনের যে বিশেষ সুযোগ অর্থবিলে যুক্ত করা হয়েছিল, সেটিও বাতিল করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটের মূল আকার বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকছে। তবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং করব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত করার লক্ষ্যেই শেষ মুহূর্তে এসব সংশোধন আনা হচ্ছে।


