
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংক পিএলসির আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শওকত আলী খানের দায়িত্বকালে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ব্যাংকের মোট আমানত ২ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, আর এই রেকর্ড গড়েছে সোনালী ব্যাংক। এদিকে(১৯ অক্টোবর) রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে অর্থ মন্ত্রণালয়। তারা হলেন সোনালী ব্যাংকের মো. শওকত আলী খান, জনতা ব্যাংকের মো. মজিবর রহমান এবং রূপালী ব্যাংকের কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম।
শওকত আলী খান ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর সোনালী ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকালে সোনালী ব্যাংক আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী, খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সবদিকে এগিয়ে যায়। এদিকে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত খানের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে হতাশাজনক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্বে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া এবং ব্যাংকিং খাতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার জন্য স্থিতিশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন। এ ধরনের নিয়োগ বাতিলের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।
তবে শওকত খানের নিয়োগ বাতিলের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচন ও সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা বজায় রাখা সহজ হবে।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে শওকত খান বলেন, “এটি শুধু সোনালী ব্যাংকের নয়, দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্যও একটি ঐতিহাসিক অর্জন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকের মোট আমানত ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। মাত্র ২১ মাসে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা নতুন আমানত যুক্ত হয়েছে। গ্রাহকদের আস্থা, সুশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে ‘২১ মাসে আমানত বেড়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা’
সোনালী ব্যাংক সূত্র জানায়, গ্রাহকসেবা উন্নয়ন, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং আমানত সংগ্রহে বিশেষ কর্মসূচির কারণে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণ থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে, যার মধ্যে নগদ আদায়ের পরিমাণ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
মো. শওকত আলী খান বলেন, “গ্রাহকের আস্থা অর্জনই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, সুশাসন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ফলেই আমানত সংগ্রহে এ সাফল্য এসেছে। গত বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৮ হাজার ১৭ কোটি টাকা। চলতি বছর শেষে তা ১২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি বাড়ানোর ফলে পরিচালন মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী। দেশজুড়ে সোনালী ব্যাংকের ১ হাজার ৩৩৫টি শাখা রয়েছে। ব্যাংকটির লক্ষ্য, কঠোর আইনি ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার একক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনা।
তিনি বলেন, “খেলাপি ঋণ আদায়ে আমরা কোনো ধরনের আপস করছি না। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, ২০২৭ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার একক অঙ্কে নেমে আসবে।”
তিনি জানান, গত ডিসেম্বরে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সেই ঘাটতি কাটিয়ে ব্যাংক ইতিবাচক মূলধন অবস্থানে এসেছে।
২০২৫ সালের আর্থিক ফলাফলে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা, ঋণ আদায় জোরদার এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল সেবা সহজ করার বিষয়গুলো ব্যাংকটির কার্যক্রমে গুরুত্ব পেয়েছে।
রেকর্ড পরিচালন মুনাফা
সোনালী ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে এই মুনাফা ছিল ৫ হাজার ৬৯৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৪০.৮ শতাংশ।
মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ
ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে মূলধন ঘাটতি দূর করাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ১৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবে ব্যাংকটি সেই ঘাটতি কাটিয়ে ৮৩ কোটি টাকার মূলধন উদ্বৃত্তে পৌঁছায়।
একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতিও দূর হওয়ার কথা জানানো হয়। ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ তৎপরতা
খেলাপি ঋণ কমানো এবং আটকে থাকা অর্থ আদায়ে ব্যাংকটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৫ সালে নগদ অর্থ আদায়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে নগদ অর্থ আদায় হয় ১ হাজার ২০৪ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের ৫৮০ কোটি টাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এ ছাড়া শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে প্রায় ৭৪৫ কোটি টাকা আদায়ের কথা জানানো হয়। ঋণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, আইনগত ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিলের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ঋণ বিতরণে যাচাই-বাছাই ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ
বড় ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই, ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ এবং ঋণখেলাপির ঝুঁকি কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও কয়েকটি শাখায় অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে শাখাভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং বিদ্যমান ঋণের মান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ক্যাশলেস লেনদেন
গ্রাহকসেবা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সোনালী ব্যাংক ডিজিটাল লেনদেন এবং বাংলা কিউআর ব্যবস্থার সম্প্রসারণে কাজ করছে।
ব্যাংকটির বাংলা কিউআর প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৬০ হাজার মার্চেন্ট হিসাব খোলা হয়েছিলএ ছাড়া সোনালী ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে ঘরে বসে বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রাহকদের সময় ও খরচ কমানো এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক লেনদেন সম্প্রসারণ
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দ্রুত ও নিরাপদে উপকারভোগীর হিসাবে পৌঁছানো, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স চ্যানেল সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাংকের কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা
২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে তিন মাসের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করে সোনালী ব্যাংক। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল ন্যাশনাল ব্যাংকের তাৎক্ষণিক তারল্য সংকট মোকাবিলা এবং আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ সহজ করা।
এটি সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব গ্রাহকসেবার বাইরে বৃহত্তর ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় নেওয়া একটি পদক্ষেপ। তবে এ ধরনের অর্থায়নের প্রকৃত ঝুঁকি ও ফলাফল মূল্যায়নে চুক্তির শর্ত, গ্যারান্টি কার্যকর হওয়ার বিধান এবং ঋণ ফেরতের অগ্রগতি বিবেচনা করা জরুরি।


