
নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র।
টানা দরপতনের পাশাপাশি একদিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ১০০ পয়েন্টের বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারের বর্তমান দুর্বলতার পেছনে একাধিক মৌলিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, শিল্প-কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি অন্যতম।তারা বলছেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে অর্থায়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কেবল আশাবাদী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বাজারে টেকসই উত্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।
নানান অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজারে মন্দা চলছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক দুর্বল কোম্পানির আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছত্রছায়ায় কারসাজি চক্র বাজার থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ তুলে নেয়। কারসাজি চক্রকে সুযোগ করে দিতে একাধিকবার বাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। এতে ওই চক্র লাভবান হলেও দুর্বল হয়ে পড়ে শেয়ারবাজারের ভিত্তি।
তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে বাজারে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয় শেয়ারবাজার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা আরও প্রকট হয়। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক শেয়ারবাজারবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।লে বিনিয়োগকারীদের মারাত্মক আস্থার সংকটে খাদের কিনারায় চলে যায় শেয়ারবাজার। ডিএসইর প্রধান সূচক পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েন বিনিয়োগকারীরা।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। দীর্ঘ মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে যায়, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একপর্যায়ে সূচকটি ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে আসে।
তবে সম্প্রতি আবারও বাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। অব্যাহত পতনের মধ্যে পড়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৫৫৮ পয়েন্টে নেমে গেছে। এর মধ্যে রোববারই (৬ সেপ্টেম্বর) কমেছে ১০৩ পয়েন্ট। এমন বড় পতনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ডিএসইতে মাত্র ৬৮ কার্যদিবসে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসেই ৩৫ কার্যদিবস হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। বিপরীতে ১৩০ কার্যদিবসে লেনদেন ছিল তিনশ কোটি টাকা বা তারও কম।
অবশ্য বর্তমান সরকারের আমলে কোনো কার্যদিবসে লেনদেন তিনশ কোটি টাকার ঘরে নামেনি। অর্থাৎ তিনশ কোটি টাকা বা তার কম লেনদেন হওয়া ১৩০ কার্যদিবস ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে।ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘গত আড়াই বছর ধরে বাজারে নতুন কোনো আইপিও নেই বললেই চলে। নতুন বিনিয়োগও নেই। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ও দেশীয় বিনিয়োগ দুটিই দুর্বল। এর সঙ্গে বিদ্যমান শিল্প-কারখানাগুলো জ্বালানি সংকটে ভুগছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতে পারছে না।’
তিনি বলেন, ‘একদিকে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যবসার ‘কস্ট অব ফান্ড’ অনেক বেড়ে গেছে। এই দুই চাপের কারণে অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমছে। একই সঙ্গে কমছে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার ধারাবাহিকভাবে বাড়বে এমন প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।’
বিএসইসির সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, ‘বর্তমান অবস্থান থেকে বাজার যদি কিছুটা বাড়ে বা কমে, এভাবে ওঠা-নামার মধ্যে থাকে তাহলে সেটিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাভাবিক বলা যায়। তবে আরও বড় ধরনের পতন হলে বাজারে হতাশা আরও বাড়বে।’একদিনে ডিএসইর প্রধান সূচক ১০০ পয়েন্টের বেশি কমে যাওয়াকে স্বাভাবিক মনে করছেন না বিএসইসির সাবেক এই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এটি অস্বাভাবিক পতন। এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে কি না, তা তিনি জানেন না। তবে বাজারে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপের কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘একজন নিয়ন্ত্রকের কাজ হলো কাজের মাধ্যমে ফল দেখানো, বেশি কথা বলা নয়। নিয়ন্ত্রকের কোনো কথা বলা উচিত নয়। নিয়ন্ত্রক কোনো কথা বলবে না এটাই স্বাভাবিক। অতিরিক্ত বক্তব্য দিলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘শুরু থেকেই আমি বলে আসছিলাম, পুঁজিবাজারে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি করা উচিত নয়। অর্থমন্ত্রী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে আশাবাদী বক্তব্য দেওয়ার ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রত্যাশার ওপর ভর করেই বাজার বেড়েছিল। কিন্তু আমি তখনই ধারণা করেছিলাম, এই উত্থান স্থায়ী হবে না।’
ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘বাজারে টেকসই গতি ফেরাতে হলে কথার চেয়ে বাস্তব উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে ভালো কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বাজারে আনতে হবে। অন্তত তিন-চারটি ভালো কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনা গেলে পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে সরাসরি তালিকাভুক্তি নয়, আইপিওর মাধ্যমে ভালো কোম্পানি আনতে হবে।’
গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বেশ কিছুদিন ধরেই বাজারে প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা না থাকায় পতনের সময় তা ব্যাপক আকার ধারণ করছে। এটাই দেশের পুঁজিবাজারের একটি মৌলিক দুর্বলতা।-ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম
এদিকে ডিএসইর প্রধান সূচকের একদিনে ১০০ পয়েন্টের বেশি পতনকে কিছুটা ‘প্যানিক’ হিসেবে দেখছেন ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে এমন পতনের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা গুঞ্জনের তথ্য তাদের জানা নেই।’
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে কিছুটা আতঙ্কিত। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক খবর আসায় সেটিও বাজারে সমস্যা তৈরি করছে।’
তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বেশ কিছুদিন ধরেই বাজারে প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা না থাকায় পতনের সময় তা ব্যাপক আকার ধারণ করছে। এটাই দেশের পুঁজিবাজারের একটি মৌলিক দুর্বলতা।’


