Friday, October 16, 2026
প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বাংলাদেশের লক্ষ্য আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো

বাংলাদেশের লক্ষ্য আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভাকে ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে তিনটি বিষয়। নতুন ঋণ ও বাজেট সহায়তা, অর্থনৈতিক সংস্কারে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ। এর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সভা চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশের জন্য এবারের সভা শুধু নতুন অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ নয়, বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের নিজস্ব অগ্রাধিকার তুলে ধরা, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং বিনিয়োগের নতুন পথ খোঁজারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

১৬ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি কিংবা বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের নতুন কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়ন প্যাকেজ চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা আসেনি। তবে, বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা এগোনোর কথা জানিয়েছেন দায়িত্বশীলরা।

আইএমএফের নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনা

বার্ষিক সভাকে ঘিরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। আগের ঋণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে নতুন অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এ অঙ্ক এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, চূড়ান্ত ঋণচুক্তি হিসেবে একে দেখার সুযোগ নেই।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং নতুন ঋণ চুক্তির বিষয়ে সরকার আশাবাদী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বেশ কিছু বিষয়ে অবস্থানের মিল রয়েছে।

১৫ অক্টোবর আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পরও অর্থমন্ত্রী আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানান। অর্থনীতি, সংস্কার এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সরকারের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও চলমান বৈশ্বিক সংঘাত বিবেচনায় বাংলাদেশের অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট বলেও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ঋণের পরিমাণ, শর্ত, মেয়াদ ও অর্থ ছাড়ের সময়সূচি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপ-পরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আইএমএফের সহায়তায় নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

নিজেদের সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরছে বাংলাদেশ

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ নিজেদের সংস্কার পরিকল্পনা উপস্থাপন করছে। দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি জাতীয় বাস্তবতা ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিতে চায়, তা উন্নয়ন সহযোগীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

তিতুমীর জানান, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার কর্মসূচিতে সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। তার মতে, এতে দেশের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ আলোচনার তাৎপর্য হলো, অর্থনৈতিক সংস্কারকে শুধু ঋণের শর্ত পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সুশাসন, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এসব ক্ষেত্রেই সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ কমানো এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।

জ্বালানি ব্যয় মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তার প্রত্যাশা

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং এ বিষয়ে একটি কাঠামোগত চুক্তির প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।

তবে, ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়নের পরিমাণ বা পৃথক প্রকল্প অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি থাকলেও সেটিকে চূড়ান্ত অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

বাংলাদেশের জন্য এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই, অর্থায়নের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো, ব্যয় যৌক্তিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

সরকারি অর্থের বাইরে বেসরকারি বিনিয়োগের সন্ধান

এবারের বার্ষিক সভায় বিশ্বব্যাংকের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো, শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য শুধু সরকারি অর্থায়ন বা উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে সংগৃহীত অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ অর্থবছরে ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি অর্থায়নসহ মোট সংগৃহীত অর্থায়ন ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এ উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে। বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের সুযোগ তৈরি, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি আকর্ষণ এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তবে, এ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ কত অর্থ পাবে বা কোন প্রকল্পে অর্থায়ন হবে, তা এখনো নির্দিষ্ট হয়নি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সাজ্জাতুজ জুম্মা গ্রেফতার